Dhaka রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বন্ড সুবিধার আড়ালে ভয়ংকর সিন্ডিকেটের অভিযোগ

চট্টগ্রাম বন্দরে রহস্যময় কন্টেইনার, কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা — নেপথ্যে “ফাহিম গ্রুপ”

দেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে ভয়াবহ প্রতারণা, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, রাজস্ব ফাঁকি ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ উঠেছে গাজীপুর চৌরাস্তাভিত্তিক কথিত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান “ফাহিম গ্রুপ” ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান “ফাহিম এটেয়ার এন্ড কম্পোজিট লিমিটেড”-এর বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস উদ্যোক্তা, সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী ও বন্দর সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বিদেশ থেকে কম দামে ফেব্রিক্স এনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সময়মতো মালামাল সরবরাহ তো দূরের কথা, মাসের পর মাস কন্টেইনার পড়ে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। অন্যদিকে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের বিষয়ে স্পষ্ট জবাব না দিয়ে সংশ্লিষ্টরা আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।ব্যাংকে কোটি টাকা জমা, পরে গা ঢাকা দেয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চায়না ও বিভিন্ন দেশ থেকে ফেব্রিক্স আমদানির নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আগাম মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়। এসব টাকা সরাসরি “ফাহিম এটেয়ার এন্ড কম্পোজিট লিমিটেড”-এর নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাব নম্বরে জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

তবে সাংবাদিকরা এসব অর্থ কোন চুক্তির ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, কেন মালামাল সরবরাহ করা হয়নি এবং এত বিপুল অর্থ কোথায় গেছে—এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা সুস্পষ্ট কোনো জবাব দেননি।
অভিযোগ রয়েছে, চায়না থেকে ফেব্রিক্স আনার সঙ্গে জড়িত নুরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে মোবাইল ফোন ব্লক করে আত্মগোপনে চলে গেছেন। অন্যদিকে কমলাপুর এলাকার সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী স্বপনও ফোন রিসিভ করছেন না বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, এটি শুধুমাত্র প্রতারণা নয়, বরং ব্যবসার আড়ালে ভয়াবহ রাজস্ব ফাঁকি, আন্ডার ইনভয়েসিং ও মানি লন্ডারিংয়ের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকতে পারে।

২০-৩০ কন্টেইনার নিয়ে রহস্য
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফাহিম গ্রুপের নামে ২০ থেকে ৩০টিরও বেশি কন্টেইনার দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যদি কন্টেইনারে বৈধ ফেব্রিক্সই থাকে, তাহলে মাসের পর মাস কেন সেগুলো ক্লিয়ার হচ্ছে না?
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঘোষণাপত্রের সঙ্গে পণ্যের মিল রয়েছে কিনা, কোনো অবৈধ পণ্য রয়েছে কিনা, কিংবা শুল্ক ফাঁকি দিতে আন্ডার ইনভয়েসিং করা হয়েছে কিনা—এসব বিষয়ে জরুরি তদন্ত প্রয়োজন।

বন্দর সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা এসব কন্টেইনার ঘিরে প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা জনমনে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান দুর্নীতি ও “ম্যানেজ” সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস ঘিরে চলমান ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। ব্যবসায়ীদের দাবি, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমস, সিএন্ডএফ, আমদানিকারক ও বন্দর সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে অবৈধ সুবিধা বাণিজ্য পরিচালনা করছে।

অভিযোগ রয়েছে, বৈধ ব্যবসায়ীদের কন্টেইনার ছাড়ে নানা জটিলতা তৈরি করা হলেও “ম্যানেজ” হওয়া কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে রহস্যজনকভাবে দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়া হয়। আবার অনেক সময় কন্টেইনার আটকে রেখে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ফাহিম গ্রুপের কন্টেইনারগুলো নিয়েও একটি প্রভাবশালী মহল সক্রিয় রয়েছে। অতীতেও প্রতিষ্ঠানটির কিছু সন্দেহজনক কন্টেইনার অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ছাড়ের চেষ্টা করা হলে গোয়েন্দা সংস্থা অভিযান চালিয়ে তা জব্দ করেছিল বলে জানা গেছে।

এনবিআর সদস্যের নাম ভাঙিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগ:
ভুক্তভোগী ও অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, ফাহিম গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখাতে এনবিআরের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেনের নাম ব্যবহার করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকরা প্রতারণা ও কন্টেইনার জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি প্রভাবশালী মহলের নাম উল্লেখ করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের গালিগালাজ করে বলেন—
“আমার বিরুদ্ধে লিখলেও কেউ কিছু করতে পারবে না।”
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ ধরনের কথোপকথনের অডিও রেকর্ডও রয়েছে।
নিরাপত্তাহীন কারখানা, তবুও বহাল বন্ড লাইসেন্স
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ফাহিম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট একটি রপ্তানিমুখী কারখানার চারপাশে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাউন্ডারি, নেই নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ব্যবস্থা কিংবা মানসম্মত গুদাম নিরাপত্তা। অথচ প্রতিষ্ঠানটি এখনো বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বন্ড লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী আমদানিকৃত কাঁচামাল নিরাপদ গুদামে সংরক্ষণ ও কঠোর নজরদারির কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকিতে:
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ী মহলের মতে, বন্ড সুবিধা মূলত রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা করার জন্য দেওয়া হয়। কিন্তু অসাধু চক্র এটি ব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ আমদানি ও অর্থপাচারের পথ তৈরি করলে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
তাদের মতে, এ ধরনের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হবে।

তদন্তের দাবি:
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল দ্রুত—
চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা সব কন্টেইনারের তল্লাশি
ঘোষণাপত্র ও প্রকৃত পণ্যের মিল যাচাই
ফাহিম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেন তদন্ত
সম্ভাব্য মানি লন্ডারিং ও রাজস্ব ফাঁকির অনুসন্ধান
কাস্টমস ও বন্দর সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অর্থ ও মালামাল ফেরত নিশ্চিত করা
জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও কর ফাঁকির মামলার দাবি জানিয়েছেন।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর্থিক লেনদেন, আমদানি নথি, ব্যাংক হিসাব, কন্টেইনারের প্রকৃত পণ্য এবং বন্ড লাইসেন্স ব্যবহারের বৈধতা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন এনবিআর এ-র একজন সদস্য।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

babu babu

জনপ্রিয় খবর

দ্রুত অপসারণ করা হচ্ছে কোরবানির বর্জ্য: ডিএসসিসি

বন্ড সুবিধার আড়ালে ভয়ংকর সিন্ডিকেটের অভিযোগ

চট্টগ্রাম বন্দরে রহস্যময় কন্টেইনার, কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা — নেপথ্যে “ফাহিম গ্রুপ”

Update Time : ০২:৩২:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

দেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে ভয়াবহ প্রতারণা, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, রাজস্ব ফাঁকি ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ উঠেছে গাজীপুর চৌরাস্তাভিত্তিক কথিত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান “ফাহিম গ্রুপ” ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান “ফাহিম এটেয়ার এন্ড কম্পোজিট লিমিটেড”-এর বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস উদ্যোক্তা, সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী ও বন্দর সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বিদেশ থেকে কম দামে ফেব্রিক্স এনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সময়মতো মালামাল সরবরাহ তো দূরের কথা, মাসের পর মাস কন্টেইনার পড়ে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। অন্যদিকে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের বিষয়ে স্পষ্ট জবাব না দিয়ে সংশ্লিষ্টরা আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।ব্যাংকে কোটি টাকা জমা, পরে গা ঢাকা দেয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চায়না ও বিভিন্ন দেশ থেকে ফেব্রিক্স আমদানির নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আগাম মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়। এসব টাকা সরাসরি “ফাহিম এটেয়ার এন্ড কম্পোজিট লিমিটেড”-এর নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাব নম্বরে জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

তবে সাংবাদিকরা এসব অর্থ কোন চুক্তির ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, কেন মালামাল সরবরাহ করা হয়নি এবং এত বিপুল অর্থ কোথায় গেছে—এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা সুস্পষ্ট কোনো জবাব দেননি।
অভিযোগ রয়েছে, চায়না থেকে ফেব্রিক্স আনার সঙ্গে জড়িত নুরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে মোবাইল ফোন ব্লক করে আত্মগোপনে চলে গেছেন। অন্যদিকে কমলাপুর এলাকার সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী স্বপনও ফোন রিসিভ করছেন না বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, এটি শুধুমাত্র প্রতারণা নয়, বরং ব্যবসার আড়ালে ভয়াবহ রাজস্ব ফাঁকি, আন্ডার ইনভয়েসিং ও মানি লন্ডারিংয়ের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকতে পারে।

২০-৩০ কন্টেইনার নিয়ে রহস্য
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফাহিম গ্রুপের নামে ২০ থেকে ৩০টিরও বেশি কন্টেইনার দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যদি কন্টেইনারে বৈধ ফেব্রিক্সই থাকে, তাহলে মাসের পর মাস কেন সেগুলো ক্লিয়ার হচ্ছে না?
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঘোষণাপত্রের সঙ্গে পণ্যের মিল রয়েছে কিনা, কোনো অবৈধ পণ্য রয়েছে কিনা, কিংবা শুল্ক ফাঁকি দিতে আন্ডার ইনভয়েসিং করা হয়েছে কিনা—এসব বিষয়ে জরুরি তদন্ত প্রয়োজন।

বন্দর সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা এসব কন্টেইনার ঘিরে প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা জনমনে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান দুর্নীতি ও “ম্যানেজ” সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস ঘিরে চলমান ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। ব্যবসায়ীদের দাবি, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমস, সিএন্ডএফ, আমদানিকারক ও বন্দর সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে অবৈধ সুবিধা বাণিজ্য পরিচালনা করছে।

অভিযোগ রয়েছে, বৈধ ব্যবসায়ীদের কন্টেইনার ছাড়ে নানা জটিলতা তৈরি করা হলেও “ম্যানেজ” হওয়া কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে রহস্যজনকভাবে দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়া হয়। আবার অনেক সময় কন্টেইনার আটকে রেখে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ফাহিম গ্রুপের কন্টেইনারগুলো নিয়েও একটি প্রভাবশালী মহল সক্রিয় রয়েছে। অতীতেও প্রতিষ্ঠানটির কিছু সন্দেহজনক কন্টেইনার অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ছাড়ের চেষ্টা করা হলে গোয়েন্দা সংস্থা অভিযান চালিয়ে তা জব্দ করেছিল বলে জানা গেছে।

এনবিআর সদস্যের নাম ভাঙিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগ:
ভুক্তভোগী ও অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, ফাহিম গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখাতে এনবিআরের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেনের নাম ব্যবহার করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকরা প্রতারণা ও কন্টেইনার জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি প্রভাবশালী মহলের নাম উল্লেখ করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের গালিগালাজ করে বলেন—
“আমার বিরুদ্ধে লিখলেও কেউ কিছু করতে পারবে না।”
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ ধরনের কথোপকথনের অডিও রেকর্ডও রয়েছে।
নিরাপত্তাহীন কারখানা, তবুও বহাল বন্ড লাইসেন্স
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ফাহিম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট একটি রপ্তানিমুখী কারখানার চারপাশে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাউন্ডারি, নেই নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ব্যবস্থা কিংবা মানসম্মত গুদাম নিরাপত্তা। অথচ প্রতিষ্ঠানটি এখনো বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বন্ড লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী আমদানিকৃত কাঁচামাল নিরাপদ গুদামে সংরক্ষণ ও কঠোর নজরদারির কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকিতে:
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ী মহলের মতে, বন্ড সুবিধা মূলত রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা করার জন্য দেওয়া হয়। কিন্তু অসাধু চক্র এটি ব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ আমদানি ও অর্থপাচারের পথ তৈরি করলে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
তাদের মতে, এ ধরনের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হবে।

তদন্তের দাবি:
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল দ্রুত—
চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা সব কন্টেইনারের তল্লাশি
ঘোষণাপত্র ও প্রকৃত পণ্যের মিল যাচাই
ফাহিম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেন তদন্ত
সম্ভাব্য মানি লন্ডারিং ও রাজস্ব ফাঁকির অনুসন্ধান
কাস্টমস ও বন্দর সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অর্থ ও মালামাল ফেরত নিশ্চিত করা
জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও কর ফাঁকির মামলার দাবি জানিয়েছেন।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর্থিক লেনদেন, আমদানি নথি, ব্যাংক হিসাব, কন্টেইনারের প্রকৃত পণ্য এবং বন্ড লাইসেন্স ব্যবহারের বৈধতা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন এনবিআর এ-র একজন সদস্য।