গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য, পদোন্নতি কারসাজি এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই অভিযোগগুলো যেন এক নতুন রূপ পেয়েছে—যেখানে একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং একজন প্রভাবশালী ঠিকাদারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য ক্ষমতার বলয়। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ইএম) আশরাফুল হক এবং ঠিকাদার মো. সাইদুল ইসলাম সোরাব—এই দুই নাম এখন গণপূর্তের ভেতরে-বাইরে একসঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও বাণিজ্যিক প্রভাবের সমন্বয়ে তারা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, যার প্রভাব পড়ছে পদোন্নতি থেকে শুরু করে টেন্ডার বণ্টন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্তরে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দু। এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সিদ্ধান্তের আর্থিক মূল্য অনেক বড়, আর সেই কারণেই এখানে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা সবসময়ই তীব্র। অভিযোগ রয়েছে, আশরাফুল হক তার প্রশাসনিক অবস্থানকে ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেন, আর সেই সুযোগ কাজে লাগান ঠিকাদার সাইদুল ইসলাম। দু’জনের মধ্যে এই সমন্বয়ই ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটে রূপ নেয়, যা টেন্ডার, নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।
সূত্রমতে, সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার পদে একযোগে একাধিক প্রকৌশলীকে পদোন্নতির উদ্যোগ ছিল এই সিন্ডিকেটের অন্যতম বড় পদক্ষেপ। অভিযোগ রয়েছে, এই পদোন্নতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত অনেকেই বাধ্যতামূলক সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হননি। তবুও তাদের এগিয়ে নিতে প্রশাসনিকভাবে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে আসে। বলা হচ্ছে, পদোন্নতির প্রত্যাশীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করে একটি অভ্যন্তরীণ সমর্থন কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, যাতে নিয়মের সীমাবদ্ধতা পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়।
অভ্যন্তরীণ একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, পদোন্নতি প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে যোগ্যতা নির্ভর কাঠামো থেকে সরে গিয়ে আর্থিক সক্ষমতা নির্ভর ব্যবস্থায় পরিণত হয়। ফলে প্রশাসনের ভেতরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। অনেকেই মনে করেন, এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রভাব নেটওয়ার্কের অংশ।
এই নেটওয়ার্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ। অভিযোগ উঠেছে, আশরাফুল হকের প্রশাসনিক অবস্থান টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে দেয়, যা মাঠপর্যায়ে কাজে লাগান সাইদুল ইসলাম। বড় বড় প্রকল্পে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার চেয়ে ‘সংযোগ’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গণপূর্তের লাইসেন্সিং শাখার তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগেও সাইদুল ইসলামের নিজস্ব লাইসেন্স ছিল না। পরে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে তিনি দ্রুত বড় প্রকল্পে অংশ নিতে শুরু করেন। সংসদ ভবন, মন্ত্রিপাড়া ও সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কাজ পাওয়ার পেছনে প্রশাসনিক সহায়তা ছিল কি না—সে প্রশ্ন এখন আলোচনায়।
অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা সীমিত করতে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু কারিগরি শর্ত আরোপ করা হতো, যা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াত। অনেক সময় যোগ্য প্রতিষ্ঠানকেও ফাইলগত জটিলতার মুখে পড়তে হতো, যা পরে ‘সমাধান’ করা হতো অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমে।
এই প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। ঠিকাদারদের একটি অংশের দাবি, টেন্ডার অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শতাংশ অর্থ প্রদানের চাপ তৈরি করা হতো। কাজের অগ্রগতি বা বিল ছাড়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে একটি সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করার চেষ্টার কথাও শোনা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করে একটি অভ্যন্তরীণ শক্তি বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল, যা ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হতো।
রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এর সমাধির অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রশাসনিক উচ্চপর্যায়ের আস্থা অর্জনের চেষ্টা হয়েছিল বলে জানা যায়। একইভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সময়কালে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের আরেকটি দিক হলো বৈদেশিক সম্পদ সঞ্চয়। সহকর্মীদের একাংশের দাবি, পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পাঠানোর পাশাপাশি নিয়মিত অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো শুরু হয়নি, তবুও বিষয়টি প্রশাসনিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, সাইদুল ইসলামের উত্থানও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে ছোট ঠিকাদার থেকে বড় প্রকল্পের অংশীদার হয়ে ওঠার পেছনে প্রভাবশালী সহায়তা ছিল কি না—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ ব্যবহার করে টেন্ডারে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা নিয়ে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। তবে তদন্ত প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে এসব বিষয় নিয়ে অসন্তোষ বাড়লেও প্রকাশ্যে খুব কম কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হচ্ছেন। অনেকেই মনে করেন, একটি অঘোষিত ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়েছে, যেখানে সরাসরি অবস্থান নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বা টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি এবং দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, আশরাফুল হক ও সাইদুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা সিন্ডিকেটের অভিযোগ এখন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার ওপর বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, এবং সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকেই মনে করছেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 








